নোয়াখালী প্রতিনিধি

সময়টা ২০২০ সালের জুন, দেশে যখন করোনা মহামারি আকার ধারণ করে। সারাদেশের ন্যায় নোয়াখালীতেও করোনায় রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। বেশির ভাগ করোনা রোগীদের শরীরে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। অক্সিজেন ও শ্বাস কষ্টে করোনায় মৃত্যু বাড়তে শুরু করে। আর তখনই নোয়াখালীবাসীর কথা চিন্তা করে এগিয়ে আসেন নোয়াখালীর মানবিক পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন। তারই অংশ হিসেবে নোয়াখালী পুলিশ হাসপাতালে ‘পুলিশ কোভিড অক্সিজেন ব্যাংক’ চালু করা হয়, যার প্রতিপাদ্য ছিল ‘মানুষের জন্য আমরা’। ১০টি হাইফ্লো অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে শুরু হওয়া এ মানবসেবা কার্যক্রমে বর্তমানে যুক্ত হয়েছে আরও ৪৫টি সিলিন্ডার। যা থেকে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও কুমিল্লা জেলার রোগীরা অক্সিজেন সেবা নিচ্ছেন। সেবার মান বাড়াতে ব্যাংকে সিলিন্ডারের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।

জানা গেছে, করোনা মহামারিতে জেলায় করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় অক্সিজেনের অভাবটি পুলিশ সুপারের পরিলক্ষিত হয়। আক্রান্তদের মধ্যে অনেকেই শহীদ ভুলু স্টেডিয়ামের অস্থায়ী কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে শয্যা সংকটের কারণে ভর্তি হতে না পেরে নিজ বাসা-বাড়িতে চিকিৎসা নেন। আর সেখানে প্রয়োজন মত অক্সিজেন পাচ্ছিলেন না, আর তাদের মধ্যে অনেকেই অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুবরণ করেন। অক্সিজেনের বিষয়টি ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক এসএম কামরুল হাসান পুলিশ সুপারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তার স্ব উদ্যোগে গত ২০২০ সালের ২৮ জুন নোয়াখালী পুলিশ হাসপাতালে অক্সিজেন ব্যাংকের উদ্বোধন করেন জেলা পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন। তখন ১০টি হাইফ্লো অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে শুরু হয় বিনামূল্যে করোনা রোগীদের মাঝে অক্সিজেন সেবার কার্যক্রম। বর্তমানে ব্যাংকটিতে ৫৫টি হাইফ্লো সিলিন্ডার রয়েছে। ৫ মে বুধবার পর্যন্ত মানবিক এ ব্যাংক থেকে সেবা নিয়েছেন ২৩৫ জন রোগী। যার মধ্যে নোয়াখালীর ১৫৯, লক্ষ্মীপুরের ৬১, ফেনীর ৬ ও কুমিল্লা জেলার ৯ জন রোগী রয়েছে। এ কাজে অংশগ্রহণ করেছেন ১৫ জন স্বেচ্ছাসেবী। যারা মোবাইলে কল ফেলে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ছুটে যান করোনা রোগীর বাড়িতে।

অক্সিজেন সুবিধা পাওয়ায় রাকিব হোসেন জানান, আমার বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। কিছুদিন আগে আমার মামা প্রচন্ড শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পর তারা জানান তাকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া লাগবে। কিন্তু এ মুহূর্তে কোথায় অক্সিজেন পাব- তা আমাদের জানা ছিল না। পরবর্তীতে পরিচিত একজনের মাধ্যমে নোয়াখালী পুলিশ অক্সিজেন ব্যাংকের নাম্বার ফেলাম। তাদের সাথে যোগাযোগ করার সাথে সাথে একটি ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে চলে আসতে বলেন তারা। পরদিন সকালে এসে আমি একটি সিলিন্ডার নিয়ে যায়। কয়েকদিন ব্যবহারের পর আমার মামা কিছুটা সুস্থ হলেও চিকিৎসক অক্সিজেন চালিয়ে যেতে বলেন। প্রথম সিলিন্ডারটি শেষ হওয়ার পর ওটা জমা দিয়ে আমি আরও একটি সিলিন্ডার নিয়ে যায়। বর্তমানে আমার মামা আগের চেয়ে ভালো আছেন।

রাসেল চৌধুরী নামে নোয়াখালী সদরের এক বাসিন্দা জানান, আমার একজন আত্মীয়ের করোনা পজিটিভ হওয়ার পর থেকে তার শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে শুরু করে। রাত ২টার সময় পুলিশ অক্সিজেন ব্যাংকের হেল্প লাইনে কল দিলে তারা রাতেই আসতে বলেন। ওই রাতে এসে কোন প্রকার মূল্য ছাড়া আমরা অক্সিজেন নিয়ে যায়। আমি বর্তমানে এ অক্সিজেন ব্যাংকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছি। পুলিশের এ মানবসেবায় নিজেকে যুক্ত করতে পারায় আমি গর্ববোধ করছি।

অক্সিজেন ব্যাংকের তত্ত্বাবধায়ক ও ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক এসএম কামরুল হাসান জানান, হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে ভর্তি হতে না পেরে মৃত্যু পথযাত্রী করোনা রোগীরা যখন দিশেহারা হয়ে নিজ বাড়িতে ফিরেন। তাদের শারীরিক অবস্থা ও শ্বাসকষ্টের কথা বিবেচনা করে আমাদের এ অক্সিজেন সেবা। রোগী বা তার স্বজনদের একটি মোবাইল কলে আমরা সম্পূন্ন বিনামূল্যে তাদের অক্সিজেন পৌঁছে দিচ্ছি। প্রথম দিকে আমাদের এ সেবা নোয়াখালী জেলায় সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে পাশের লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও কুমিল্লার লোকজনও আমাদের থেকে সেবা নিচ্ছেন।

তিনি আরও জানান, গত বছরের ২৬ জুন আমি কাজ শেষ করে বাসায় ফেরার পথে সুধারাম মডেল থানার সামনে একটি সিএনজিতে একজন করোনায় আক্রান্ত রোগীকে দেখতে পাই। এগিয়ে গিয়ে দেখি অক্সিজেন না পেয়ে শ্বাসকষ্টে কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যান তিনি। চোখের সামনে এমন মৃত্যু যন্ত্রণা দেখে সহ্য করতে না পেরে আমি পুলিশ সুপারের সহযোগিতায় অক্সিজেন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করি এবং দুই দিনের মধ্যে এসপি স্যারের সহযোগিত আমরা তা শুরু করি।

জেলা পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন জানান, করোনার প্রথম ঢেউ শুরু হওয়ার পর মানুষের মধ্যে নানা সন্দেহ, সংশয় ও ভীতি কাজ করত। আপনজনের লাশ ফেলেও চলে গেছেন অনেকে। সে দৃশ্যগুলো আমাদের চোখে পড়ে, যা আমাদের খুব কষ্ট দেয়। এরই মধ্যে আমাদের কয়েকজন পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হন। যার মধ্যে দুজনকে ঢাকা স্থানান্তর করা হয়। ঢাকা নেওয়ার পথে গাড়িতে তাদের অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়ায় বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল। এসব ঘটনা থেকে পুলিশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে প্রথম আমরা অক্সিজেন ব্যাংক চালু করার চিন্তা করি এবং প্রথমে ১০টি সিলিন্ডার নিয়ে পুলিশ কোভিড অক্সিজেন ব্যাংক যাত্রা করি। বর্তমানে আমাদের ৫৫টি হাইফ্লো সিলিন্ডার রয়েছে। যেসব রোগীর আত্মীয় স্বজন আমাদের কাছে এসে সিলিন্ডার নিতে পারছেন না, আমরা নিজেরাই তাদের বাসা-বাড়িতে সিলিন্ডার পৌঁছে দিচ্ছি। তাছাড়াও সিলিন্ডার নেওয়ার পর তা খালি হলে যারা টাকার অভাবে গাড়ি করে তা হাসপাতালে পৌঁছে দিতে পারছেন না তাদের বাসায় আমাদের লোক পাঠিয়ে তা নিয়ে আসা হচ্ছে। খালি সিলিন্ডারগুলো আবার রিফিল করার সব খরচ জেলা পুলিশ বহন করছে।

এসিপি আরও বলেন, যতদিন করোনা ভাইরাস থাকবে ততদিন আমাদের এ বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা চালু থাকবে। দুর্দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের লক্ষ্য ছিল। মানুষের সেবার মান আরও বাড়াতে অক্সিজেন ব্যাংকে সিলিন্ডারের সংখ্যা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published.