দেশে গত মাস থেকে ক্রমেই ঊর্ধ্বগতি ছিল করোনা শনাক্ত ও মৃত্যুর হার। গত কয়েকদিন ধরে নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে এই হার। ফলে হাসপাতালে কমতে শুরু করেছে রোগীর চাপ। কিছুদিন ধরে আইসসিইউ তো দূরে থাক, হাসপাতালের সাধারণ বেড পাওয়াও দুষ্কর ছিল। সেখানে এখন সারাদেশে কয়েক হাজার বেড ফাঁকা। করোনা পরিস্থিতির এমন উন্নতির পেছনে লকডাউনের প্রভাব আছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও সর্বাত্মক লডকাউন দেশজুড়ে ঢিলেঢালাভাবে পালিত হওয়ায় সমালোচনাও করছেন তারা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার পর‌্যন্ত আট বিভাগের করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে আট হাজার ৩৩৫টি করোনার সাধারণ শয্যা এবং ৪৫৯টি আইসিইউ শয্যা খালি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা শনাক্তের হার কিছুটা কমলেও মৃত্যুর হার এখনো উদ্বেগজনক। তাই সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া কঠোর বিধিনিষেধ অব্যাহত রাখতে হবে। ঈদ সামনে রেখে গণপরিবহণ চালু করলে সারাদেশে মানুষ ছুটবে। এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও আবারো বিপরর‌্যয় নেমে আসতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘রোগী কম শনাক্ত হওয়াটা ভালো দিক। কিন্তু মৃত্যুর হার এখনো অনেক। তাই এখনো অনেক পথ বাকি। মৃত্যুর হারও কমিয়ে আনতে হবে। সেজন্য কঠোর বিধিনিষেধ তুলে দেয়া যাবে না।’

হঠাৎ শনাক্তের হার কমে যাওয়ার কারণ কী, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা লকডাউন বলি না। সরকার যে বিধিনিষেধ দিয়েছে তার একটা প্রভাব অবশ্যই আছে। কারণ দোকানপাট খুলে দিলেও অফিস বন্ধ, বিয়েশাদী হলেও সীমিত আকারে হচ্ছে, ওয়াজ মাহফিল-সভা, সমাবেশ বন্ধ আছে।

তিনি আরো বলেন, এখন যে শনাক্ত দেখাচ্ছে এটা কিন্তু দুই সপ্তাহ আগের পরিস্থিতির ফলাফল। আর এখন যে অবস্থা চলছে তার ফলাফল আবার পরে বোঝা যাবে সামনে। তাই এখন বিধিনিষেধ তুলে ফেললে পরিস্থিতি আবার খারাপের দিকে চলে যাবে। সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যাতে একটু কম হয় সেভাবে পরিকল্পনা নিতে হবে।

গতবছর মার্চে দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে রোগী ও করোনায় মৃত্যুর হার। চলতি বছরের শুরুতে মৃত্যু এক অংকের কোটায় নেমে এসেছিল। শনাক্তও বেশ কম ছিল। কিন্তু মার্চ থেকে আবার উদ্বেগজনক হারে শনাক্ত ও মৃত্যু বাড়তে শুরু করে। একদিনে মৃত্যু একশো ছাড়িয়েছে চলতি মাসে।

এমন অবস্থায় দেশজুড়ে প্রথমে কঠোর বিধিনিষেধ, পরবর্তিতে দেয়া হয় সর্বাত্মক লকডাউন। গত ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া লকডাউন এখনো বলবৎ আছে। সরকার লকডাউন আরো বাড়ানোর কথা ভাবছে।

এদিকে মাঝে দিনে ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়া করোনা শনাক্তের হার এখন ১০ এর ঘরে নেমে এসেছে। যদিও মৃত্যু এখনো ৮০র ঘরেই আছে।

ঢাকার হাসপাতালের হালচাল

হাসপাতালগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগে এই মুহূর্তে সরকারি হাসপাতালে মোট করোনা ডেডিকেটেড শয্যা রয়েছে ১২ হাজার ৩৬৫টি। মোট আইসিইউ শয্যা এক হাজার ৮৪টি। এগুলোর মধ্য থেকে বহু সংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ায় এখন আট হাজার ৩৩৫ সাধারণ ও ৪৫৯ আইসিইউ মোট আট হাজার ৭৯৪ শয্যাগুলো খালি রয়েছে।

এর মধ্যে ঢাকা মহানগরের হাসপাতালগুলোতে মোট সাধারণ শয্যা পাঁচ হাজার ৬৪৪টির মধ্যে খালি রয়েছে তিন হাজার ৪১৩টি। মোট আইসিইউ ৭৬৯টির মধ্যে খালি রয়েছে ৩২৮টি। এর মধ্যে ১৩টি সরকারি ও ১৩টি বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বৃহস্পতিবারের দেয়া বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঢাকা মহানগরের ১৩টি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে- ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ৭০৫টি শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে ২৪৫টি, মোট আইসিইউ ২০টির মধ্যে কোনো শয্যা এখন খালি নেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে মোট ২৩০টি সাধারণ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে ১১৫টি, ২০টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে চারটি।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের মোট ৩০০ সাধারণ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে ৪৬টি, ১০ আইসিইউ শয্যার একটিও খালি নেই।

মুগদা জেনারেল হাসপাতালের মোট ৩৬০ সাধারণ শয্যার মধ্যে বর্তমানে খালি রয়েছে ২৩০টি, ১৯ আইসিইউ শয্যার খালি মাত্র একটি।

কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের মোট ১৬৯টি সাধারণ শয্যার মধ্যে খালি আছে ১০৭টি এবং ২৬ আইসিইউ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে চারটি।

শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালের মোট ১৭৪টি সাধারণ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে ৯৫টি এবং মোট ১৬ আইসিইউ শয্যার মধ্যে খালি পাঁচটি।

এদিকে, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ২৮৮টি সাধারণ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে ১৮৩টি এবং ১০ আইসিইউ শয্যার খালি একটি। সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের ৯৪টি সাধারণ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে ৭৪টি এবং ছয় আইসিইউ শয্যার মধ্যে খালি একটি।

রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের ৪৮৫টি সাধারণ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে ৩৬৪টি এবং ১৫ আইসিইউ শয্যার মধ্যে খালি ১০টি। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ১০টি সাধারণ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে আটটি।

এনআইসিভিডি হাসপাতালের মোট ১৩৭টি সাধারণ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে ১২১টি। টিবি হাসপাতালের ২০০টি সাধারণ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে ১৮৭টি এবং পাঁচটি আইসিইউ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে চারটি।

মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে মোট ২০০ সাধারণ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে ৭৬টি এবং ১০০ আইসিইউ শয্যার মধ্যে খালি রয়েছে ১৮টি।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published.