বিনোদন প্রতিবেদক

সব অভিনয় শিল্পীদের স্বপ্ন থাকে বড় কোনো প্লাটফর্মে অভিনয় করা। আর সেখানে হলিউডের মতো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি হলে তো কথায় নেই। সেই স্বপ্নের জায়গায় অভিনয় করেছেন তিনি। আশির দশকে বাংলাদেশের মঞ্চ নাটক এবং টিভি নাটকের একজন পরিচিত মুখ নায়লা আজাদ নূপুর। মঞ্চ নাটক ও টিভি নাটকের পাশাপাশি তিনি অসাধারণ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি শুধু দেশের নাটক-সিনেমাতেই অভিনয় করেন নি, বরং হলিউড সিনেমা জগতেও তার পদচারণা রয়েছে। তিনিই হলিউডে অভিনয় করা প্রথম ও একমাত্র বাংলাদেশি।

১৯৮৯ সালে নায়লা আজাদ নূপুর স্কোলারশিপ পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্টিয়াক ইউনিভার্সিটিতে থিয়েটার নিয়ে পড়তে যান। সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর ১৯৯৭ সালে তিনি ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া’ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন।

আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরুর পর থেকে তিনি নানা স্টেজ শোতে অভিনয় করা শুরু করেন। এ ছাড়াও তিনি বেশ কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র এবং প্রামাণ্যচিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৯৮ সালে ‘স্টর্ম ইন দ্য আফটারনুন’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে হলিউড সিনেমা জগতে অভিষেক হয় নায়লা আজাদ নূপুরের।

‘স্টর্ম ইন দ্য আফটারনুন’ সিনেমায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাতের পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে ধরা পড়া চার ব্যক্তির জীবনের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। এই সিনেমার চারটি কেন্দ্রীয় চরিত্রের একটিকে অভিনয় করেছেন নায়লা আজাদ নূপুর।

আমেরিকান সিনেমায় সচরাচর যেভাবে বাংলাদেশি ও ভারতীয় ইমিগ্রেন্টদের দেখানো হয় এই সিনেমায় তা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখানো হয়েছে। এই সিনেমায় অভিনয় করার মধ্যমেই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে হলিউড সিনেমায় অভিনয় করার কীর্তি অর্জন করেন নায়লা আজাদ নূপুর। ২০০৯ সালে ‘ক্রসিং ওভার’ সিনেমায় অভিনয় করার মাধ্যমে নায়লা আজাদ হলিউডে পরিচিতি অর্জন করেন। এই সিনেমায় তিনি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছেন। ওয়েন ক্র্যামার পরিচালিত ‘ক্রসিং ওভার’ সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন জনপ্রিয় হলিউড তারকা হ্যারিসন ফোর্ড।

আমেরিকায় সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে এই সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে। এ ছাড়াও এই সিনেমায় যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস-এ বসবাসরত বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীদের জীবনযুদ্ধ তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমাটিতে একটি বাংলাদেশি পরিবারের কাহিনীও দেখানো হয়েছে। নায়লা আজাদ নূপুর এই বাংলাদেশি পরিবারটির মা রোকেয়া জাহাঙ্গীর-এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘ক্রসিং ওভার’ সিনেমাটিতে বেশ কিছু বাংলা সংলাপও রয়েছে। সিনেমার পাশাপাশি নায়লা আজাদ নূপুর হলিউডের দু’টি টিভি সিরিজে অভিনয় করেছেন।

ফক্স টিভির ‘লাই টু মি’ সিরিজে ছোট একটি চরিত্রে দেখা যায় তাকে। স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও তিনি মাঝে মাঝে ছুটিতে দেশে আসতেন এবং ছুটিতে দেশে এসে তিনি বেশ কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। দেশের চলচ্চিত্র জগতেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ১৯৮০’র দশকে তিনি বেশ কিছু অসাধারণ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৮০ সালে ‘ঘুড্ডি’ সিনেমায় অভিনয় করার মাধ্যমে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে নায়লা আজাদ নূপুরের অভিষেক হয়।

তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো- ‘ঘুড্ডি’ (১৯৮০), ‘মোহনা’ (১৯৮৩), ‘দহন’ (১৯৮৫), ‘কিত্তনখোলা’ (২০০০), ‘ঘাসফুল’ (২০১৫), ‘বাঙালি বিউটি’ (২০১৮) ইত্যাদি।

১৯৭০ এবং ১৯৮০’র দশকে বাংলাদেশের টিভি নাটক ও মঞ্চ নাটকের নিয়মিত সদস্য ছিলেন নায়লা আজাদ নূপুর। তাঁর করা উল্লেখযোগ্য টিভি নাটক- ‘রত্নদ্বীপ’ (১৯৭৪), ‘নিশিত তৃষ্ণায়’ (১৯৮০), ‘আওরঙ্গজেব’ (১৯৮২), ‘আয়না’ (১৯৮২) ‘শেষ বংশধর’, ‘ভালোবাসি ঘাস’, ‘কোথায় যাব আমি কীসের বিচার চাইবো’, ‘ক্যাক্টাস’, ‘যাদুর শহর’ (২০১১), ইতি বৃত্তান্ত (২০১৫) ইত্যাদি।

তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য মঞ্চ নাটক- ‘কেরামত মঙ্গল’, ‘শকুনতলা’, ‘মুন্তাসির ফ্যান্টাসি’, ‘ফণীমনসা’, ‘কিত্তনখোলা’ ইত্যাদি। তিনি ঢাকা থিয়েটারের একজন নিবেদিত কর্মী ছিলেন। তিনি একাধারে একজন অভিনেত্রী, নৃত্যশিল্পী এবং নাট্য নির্দেশক। ২৫ বছর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পর নায়লা আজাদ নূপুর ২০১৪ সালে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য দেশে ফেরেন।

বর্তমানে তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ’ (আইইউবি) এবং ‘ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ’ (ইউল্যাব)-এ শিক্ষকতা করেন। এ ছাড়াও তিনি একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্মে আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত আছেন। পাশপাশি তিনি বেশ কিছু মঞ্চ নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর অভিনীত ‘প্রতিরুদ্ধ’ সিনেমাটি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন আছে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published.