প্রতিবছর ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে কুড়িগ্রামের অনেক পরিবার। অধিকাংশই আর ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবার তাৎক্ষণিক সহায়তা পেলেও স্থায়ী পুনর্বাসন কার্যক্রম সীমিত। ফলে বাড়ছে কুড়িগ্রামে দরিদ্রতার হার। অন্যদিকে, শুষ্ক মৌসুমেও নদী ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কুড়িগ্রামবাসী।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী বালু ফসলি জমির পাশেই পাট খড়ি, পলিথিন, বস্তা এবং কাঁথা দিয়ে তৈরি ১২/১৪ ফুট দৈর্ঘের একটি ঝুপড়ি ঘর। প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই ঝুপড়িতেই ইব্রাহিম-ছালেহা বেগম দম্পতির বসবাস। ইব্রাহিম শেখ খলিলুল্লা একজন খড়ি বিক্রেতা। যেদিন খড়ি বিক্রি হয় সেদিন পেটে ভাত পড়ে আর না হলে অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হয়।

ইব্রাহিম-ছালেহা দম্পতির দুই ছেলে এবং দুই মেয়ে। এক ছেলে ও এক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট মেয়ে দুলালী ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী। ছোট ছেলে পড়ালেখা বাদ দিয়ে কিশোর বয়সেই কাজের সন্ধানে টাঙ্গাইল অবস্থান করছে মাস খানেক আগে। বড় ছেলে তার স্ত্রী নিয়ে পরিবার খোঁজ না নিয়ে টাঙ্গাইলে থাকে। ইব্রাহিম-ছালেহা বেগম দম্পতির বড় মেয়ে মর্জিনা বেগম। মাস খানেক হলো মর্জিনা তার দুটি সন্তানকে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে আশ্রয় নিয়েছেন বাবার বাড়িতেই।

ইব্রাহিমের বাড়ি উলিপুর উপজেলার ধরলা এবং ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বেষ্টিত বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের উত্তর বালাডোবা গ্রামে।

তিনি বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে মোর বাপ-দাদার কয়েক বিঘা আবাদী জমিসহ ভিটে মাটি বিলীন হয়ে গেছে ৭/৮ বছর হইল। নিজের শেষ সম্বল বাড়িভিটে চার শতকও বিলীন হয়ে গেছে পাঁচ বছর আগে। সেই থেকে বউ, ছোয়াসহ এই ঝুপড়িতেই আছি। অসুস্থ স্ত্রী, কন্যা, নাতিকে নিয়ে মাটিতে থাকতে হয়। বড় বেটা বউ নিয়া জুদা (আলাদা) থাকে টাঙ্গাইলে। ছোট বেটা কাজের খোঁজত তাইও টাঙ্গাইল গেছে। এলা স্ত্রী, দুই বেটি আর দুই নাতি নিয়া এই ছাপড়া ঘরতেই থাকি। খড়ি বেচা হইলে প্যাটত ভাত যায়। আর না হইলে উপাস থাকা খায়। সরকারি কোনো সাহায্য হামরা পাই না।’

অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল জলিল বলেন, ‘বাহে চরাঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যবাহী মোল্লারহাটসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়েছে। এমপি, মন্ত্রী হামার এডে কোনো আইসে না, খোঁজ খবরও নেয় না। হামার আর কাই দ্যাখে।’

৬ নম্বর ওয়ার্ডে মেম্বার মহুবার বাদশা জানান, ইব্রাহিমসহ অনেক পরিবার নদী ভাঙনের স্বীকার হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। ইউনিয়নের সরকারি বরাদ্দ যা আসে তাতে প্রত্যন্ত এলাকার অভাবী মানুষের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, শুষ্ক মৌসুমেও কুড়িগ্রামে অন্যান্য নদীর তুলনায় ধরলা নদীর ৫/৬টি পয়েন্টে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। মোল্লারহাটে নদী ভাঙন রোধে পাঁচ শতাধিক জিও ব্যাগ দেয়া হয়েছে। যেগুলোর ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু হবে। এছাড়াও ভাঙন রোধের জন্য বাজেট চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। যা অনুমোদন পেলে স্থায়ীভাবে কাজ শুরু হবে।

অন্যদিকে জেলা ত্রাণ ও পূণর্বাসন কর্মকতা আব্দুল হাই জানান, শুকনো মৌসুমে বাড়ি-ঘর বিলীন হবার কোনো তথ্য তার কাছে নেই। তবে পুর্ণবাসন বিষয়ে এই কর্মকর্তা জানান, মুজিব শত বর্ষ উপলক্ষ্যে বর্তমান সরকার গৃহহীনদের জন্য জমিসহ ঘর প্রদান করছে। জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তালিকা পেলে আমরা যাচাই-বাছাই করে তাদের সেই ঘরের বন্দোবস্ত করে দেয়া হবে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published.