রাজধানীতে মশার উৎপাত অসহনীয় পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মশার ওষুধ ছিটানো হলেও তা তেমন কাজে আসছে না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস জানিয়েছেন, তারা নতুন কীটনাশক ছিটানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। এতে মশার উৎপাত অনেকটা কমে যাবে বলে আশা করছেন নগর কর্তৃপক্ষ।

তবে মেয়র তাপসের মতে, শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য ঢাকায় জীববৈচিত্র্য বাড়াতে হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে নগরবাসীর ভূমিকা জরুরি বলে মনে করেন মেয়র তাপস।

জার্মানভিত্তিক বার্তা সংস্থা ডয়চে ভেলের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মেয়র ফজলে নূর তাপস এসব কথা বলেন। মশা নিয়ন্ত্রণসহ নগরীর বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন মেয়র। তার সেই সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-

আপনারা এত চেষ্টা করছেন, তারপরও কেন মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না?

আমি দায়িত্ব নেয়ার পরই মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ঢেলে সাজিয়েছি৷ আগের বছরগুলোতে আমাদের অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত৷ এডিস মশার কারণে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছিল৷ আগে যেখানে এক ঘণ্টা মশক নিধনের কার্যক্রম চলতো, এখন সেখানে চার ঘণ্টা করা হয়েছে৷ সেভাবেই আমরা জনবল বাড়িয়েছি৷ এখন সকালে যারা কাজ করছেন, তারা শুধু সকালেই করছেন৷ বিকালে যারা করছেন, তারা শুধু বিকালেই করছেন৷ পুরো ৭৫টি ওয়ার্ডে সকালে আমরা আটজন করে দিয়েছি৷ বিকালে প্রথম দফায় ১০ জন করে দেয়া হয়েছিল, এখন সেটা পাঁচজন করা হয়েছে৷ নগর ভবনের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এটা মনিটরিং করছেন৷ ডেঙ্গু মশার বিরুদ্ধে আমরা যে কার্যক্রম নিয়েছি, তাতে আমরা সফল হয়েছি৷ ডেঙ্গুতে তেমন কোনো প্রাণহানি হয়নি৷

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা বলছে,গত বছরের তুলনায় এ বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় মশার ঘনত্ব চার গুণ বেড়েছে৷ এটা কেন?

আমরা সর্বশেষ যে প্রতিবেদন পেয়েছি, সেটা ডেঙ্গুর ওপরই হয়েছিল৷ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ আগের বছরগুলোর তুলনায় একেবারেই কম৷ এডিস মশার বিরুদ্ধে আমাদের কার্যক্রমটা সফল হয়েছে৷ আমরা সমন্বিতভাবে কার্যক্রমটা নিয়েছি৷ আমাদের বাসা-বাড়ি বা ঘরের আশপাশে যে পানি জমে থাকে, সেখান থেকে এডিস মশা হয়৷ আর কিউলেক্স মশা বদ্ধ বড় জলাশয়ে হয়৷ এখনো ঢাকা শহরে আমাদের অনেক খাল ও জলাশয় রয়েছে৷ গবেষণা থেকে আমাদের বলা হয়েছিল, ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে কার্যক্রমটা চলমান রাখতে৷ কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম, শীতকাল চলে গেলেও পানির স্তর নেমে যাওয়ায় বদ্ধ জলাশয়ে কিউলেক্স মশার ব্যাপক প্রজনন হয়৷ এখন আমরা যে সূচি করবো, সেখানে এপ্রিল থেকে নভেম্বর এবং নভেম্বর থেকে এপ্রিল৷ কারণ, কিউলেক্স মশার প্রজনন হয়ে গেলে সেটার ব্যাপক বিস্তার হয়ে যায়৷ যেটা আমরা দেখেছি, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারিতে ব্যাপক বিস্তার হয়েছে৷ এই মার্চে মশার প্রজনন ও বিস্তার কমে আসছে৷ আমরা আশাবাদী যে, আগামী সপ্তাহ থেকে আরও কমে আসবে৷ অন্য যে কোনো বছরের তুলনায়, আমাদের এখানে মশক এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে৷ আমাদের যেহেতু অনেক খাল বা জলাধার আছে, সেই কারণে কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে আনতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা নিতে হবে৷ খালগুলো পরিষ্কার করার কাজ চলছে, এটা শেষ হলে ঢাকাকে পুরোপুরি মশকমুক্ত করা যাবে৷

আপনি তো গত জুন মাসে রমনা লেক, খিলগাঁওয়ের বটতলা ঝিলসহ তিনটি জলাশয়ে মশা মারতে তেলাপিয়া মাছ ও হাঁস ছেড়েছিলেন৷ রমনা লেকের কিছু হাঁস এরই মধ্যে মরে গেছে৷ ফলে মশা মারার এই উদ্যোগ কতটা কাজে এসেছে?

বিশ্বব্যাপীই শুধুমাত্র কীটনাশকের ওপর নির্ভর করে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম হয় না৷ এর জন্য সমন্বিত উদ্যোগের দরকার হয়৷ সে কারণে আমরা বছরব্যাপী সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে সাজিয়েছি৷ আমি জানি না, কেন বিশেষজ্ঞরা বিষয়টা তুলে ধরছেন না৷ সেটা হলো, আমাদের জীববৈচিত্র্যের যে ভারসাম্য, সেটা ঢাকা শহরে একদম ভেঙে পড়েছে৷ ৩০ বছর আগেও যেখানে লার্ভা ধ্বংসের মতো জীববৈচিত্র্য ছিল, এখন তা নেই৷ এজন্য জীব বৈচিত্র্যের ভারসাম্যটা বৃদ্ধি করতে হবে৷ শুধু কীটনাশক দিয়ে মশক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না, এটা শারীরিকভাবে ও স্বাস্থ্যগতভাবে খুবই ঝুঁকির সৃষ্টি করে৷ এই কারণে আমরা হাঁস ও মাছ চাষ করছি৷ ১০টি জলাশয়কে আমরা ঠিক করেছি, সেখানে ভবিষ্যতে আমরা হাঁস ও মাছের পাশাপাশি ব্যাঙও চাষ করবো, যাতে জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়৷

আপনার কী মনে আছে, শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আপনাদের সতর্ক করে বলেছিলেন, মশা আপনাদের ভোট যেন খেয়ে না ফেলে?

প্রধানমন্ত্রীর সেই বক্তব্যকেই আমরা শিরোধার্য হিসেবে নিয়েছি৷ করোনা মহামারির মাঝেও আমরা মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিয়েছি৷ এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো, কীটনাশক যখন দীর্ঘদিন প্রয়োগ করা হয়, তখন তাদের সহনশীলতাও বৃদ্ধি পায়৷ এজন্য আমরা কীটনাশকটা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছি৷ আশা করছি, আগামী সপ্তাহ থেকেই নতুন কীটনাশক ব্যবহার করতে পারবো৷ এর মাধ্যমে মশক আরও নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আমরা আশাবাদী৷

গত চার বছরে মশার পেছনে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ব্যয় হয়েছে ৭৬ কোটি টাকা৷ তারপরও কেন মশার উপদ্রব কমছে না?

আমি ঢাকাবাসীর কাছেও এ বিষয়টি তুলে ধরতে চাই যে, আমরা প্রচুর অর্থ ব্যয় করি মশক নিধনে, প্রচুর অর্থ ব্যয় করি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়৷ এটা সকলের নজরে আসা উচিত৷ মশক নিয়ন্ত্রণে আমাদের প্রায় এক হাজারের মতো জনবল প্রতিদিন কাজ করে৷ এর জন্য আমাদের ব্যাপক বেতনও দিতে হয়৷ আমাদের বেতনের একটা বড় অংশ কিন্তু এই মশক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়৷ আমাদের খরচের একটা বড় অংশও মশক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়৷ সবাই যদি আমরা সচেতন হই যে, আশপাশ পরিষ্কার রাখি, যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলি, জলাশয়গুলো যদি পরিষ্কার রাখি তাহলে কিন্তু এত খরচ করতে হয় না৷ এখানে আমি ঢাকাবাসীকে এগিয়ে আসতে বলবো৷

যারা মশার ওষুধ ছিটানোর কাজ করেন, তাদের কীভাবে মনিটর করা হয়?

আমাদের যে সাংগঠনিক কাঠামো আছে, সেই অনুযায়ী তদারিক করা হয়৷ যে কর্মীরা ওষুধ ছিটানোর কাজ করেন, তাদের দেখভালের জন্য একজন সুপারভাইজার আছে৷ তার উপরে একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আছেন৷ তার উপরে কাউন্সিলররা এটা তদারকি করে থাকেন৷ এর উপরে আমাদের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা আছেন৷ তার উপরে আমাদের প্রধান কার্যালয়ে উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আছেন৷ তাকে আমরা এটার দায়িত্ব দিয়েছি৷ তাছাড়া আমরা যারা কর্মকর্তা আছি, আমরা তো তদারকি করছিই৷ আমরা চেষ্টা করছি নিবিড়ভাবে তদারকি করার৷ তারপরও গাফিলতি থাকতে পারে৷ যখন যেগুলো নজরে আসে, তখনই ব্যবস্থা নিই৷

দীর্ঘদিন ধরেই মশার ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে৷ এখন যে ওষুধ আনতে চাচ্ছেন সেটার কার্যকারিতা কতটুকু পরীক্ষিত?

এটা তো সাধারণ কোনো কীটনাশক না৷ সরকারি কিছু নিয়মনীতি আছে, সেগুলো পরিপালন করেই ওষুধ আনতে হয়৷ কতটুকু ওষুধ প্রয়োগ করা যাবে সেটার সীমাও কিন্তু নির্ধারণ করা আছে৷ একটা নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মেনেই এটার প্রয়োগ করতে হয়৷ বিশেষজ্ঞরা আমাদের সুপারিশ করেন, কখন কোন কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে৷ তাদের মতামতের ভিত্তিতেই আমরা কীটনাশক আমদানি এবং প্রয়োগ করে থাকি৷ একটা বিষয় জানিয়ে রাখি, আমরা কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতেই বাৎসরিক কীটনাশক একবারে এনে থাকি৷ কিন্তু দেশে আনার পর যদি দেখা যায়, সেই কীটনাশকে কাজ হচ্ছে না, তাখন কিন্তু আমরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হই৷

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকার কারণে মশার উপদ্রব কমছে না৷ আপনি কী মনে করেন?

আমাদের এখন যেভাবে কাজ হচ্ছে তাতে আমি মনে করি না যে, ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে৷ বিশেষজ্ঞরা আমাদের যে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর কার্যক্রম পরিচালনা করা৷ আমার মনে হয়, সেখানে একটু ভুল হয়েছে৷ বরং আমাদের সূচি অনুযায়ী যদি আমরা নভেম্বর থেকে কিউলেক্স মশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতাম, তাহলে এ পর্যায়ে মশক এত বৃদ্ধি পেতো না৷ ভবিষ্যতে আমরা এই বিষয়টা অবশ্যই দেখবো৷

মাছ ও হাঁসের পর এবার আপনারা জলাশয়ে ব্যাঙ ছাড়তে যাচ্ছেন, এসব করে কী নগরবাসীর জন্য কোন সুখবর আপনি দিতে পারবেন?

আমি তো আগেই বলেছি৷ ঢাকায় জীববৈচিত্র্য একেবারেই ভেঙে পড়েছে৷ জীববৈচিত্র্য রক্ষা পেলে আজকে মশক এ পর্যায়ে বৃদ্ধি পেত না৷ আমরা নিজেরাও ছোট বেলায় এগুলো উপলব্ধি করেছি৷ তখন কিন্তু মশকের পেছনে এত টাকা ব্যয় করতে হতো না৷ ধীরে ধীরে এই প্রক্রিয়াটা সমন্বিত রূপ পাবে তখন আমরা ফল পাবো৷ আজকেই কিন্তু এর ফল পাওয়া যাবে না৷ বহির্বিশ্বে যেহেতু এটা একটা পরীক্ষিত প্রক্রিয়া, তাই ভবিষ্যতে নিশ্চয় আমরা এটার ফল পাবো৷

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published.